গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা । তথ্যবিন্দু: বিবাহ
30 May 2024
#digitaltextarchiveবাংলা Featured
১। প্রবন্ধ: ‘বহু বিবাহ’
২। কবিতা: (‘নিতান্ত অনুগত কোন কুলীন দুহিতার’ লেখা)
কুমারখালী গ্রাম থেকে ১২৭০ (১৮৬৩) সালের বৈশাখ মাসে হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা শুরু করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল গ্রামবাংলার করুণ অবস্থার কথা ব্রিটিশ সরকারের নজরে আনা। ব্রিটিশ ভারতে পত্রপত্রিকা প্রকাশনাকে একটি দেশীয় ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু খুব কম পত্রিকাই মনে হয় লাভের মুখ দেখেছে। সমাজসেবার দায় নিয়ে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েও সম্পাদকেরা পত্রিকা প্রকাশের সাহস দেখিয়েছেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার শুরু থেকেই ছিল আর্থিক অনটন। নিজের জীবন জর্জরিত করে হরিনাথ মজুমদার ২০ বছরের বেশি সময় ধরে পত্রিকা চালিয়ে গেছেন। কথার খেলাপ করায় বাদবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন পত্রিকা গ্রহণেচ্ছুক স্বাক্ষরকারীদের সঙ্গে। পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা যেমন সামাজিক উন্নতির সাধন বলে মনে করা হত, তেমনি পত্রিকার গ্রাহক হয়ে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করাকে একটি সামাজিক কর্তব্য বলে মনে করতেন হরিনাথ। কিন্তু তিনি গ্রাহকদের নিরবিচ্ছিন্ন সহায়তা পাননি। অনাদায়ী গ্রাহকদের প্রতারণার কথা জানাতে, হরিনাথ শুরু করেছিলেন ‘রঙ্গভূমী’ নামে একটি নিয়মিত বিভাগ। তাই সম্পাদকীয় মন্তব্য, পত্রিকা পরিচালনা ও সম্পাদনা, পত্রিকা গ্রাহক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রকল্পperiodicalDB-তে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার বর্ষ ৩, ১২৭২ (১৮৬৫) এর ১২টি সংখ্যার রচনাসূচী আছে। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার প্রায় সব রচনাই হরিনাথের লেখা। তবে কয়েকজন পত্রপ্রেরকের নাম ও স্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
সব রচনার শিরোনামের সাথে উদ্ধৃতাংশ দেওয়া আছে। রচনাগুলিকে বিষয়ভিত্তিক ভাবে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার বর্ষ ৩এর সংখ্যাগুলিকে বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন বিষয় পাওয়া যাবে। যেমন শিক্ষা, বিবাহ, নারী, অপরাধ-বিবাদ-আইনকানুন, ভারতীয় রেল, ভারতীয় ডাক, কৃষি, আবহাওয়া-জলবায়ু ইত্যাদি।
বিষয়ের সামগ্রিক তালিকা পাওয়া যাবে প্রকল্পperiodicalDB-র তথ্যবিন্দু বিভাগের নিশানা ও চাবিকাঠি পাতায়।
বিবাহ— এই বিষয়ের ২টি রচনা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা থেকে এই পাতায় পুনঃপ্রকাশ করা হল। প্রথমটি একটি প্রবন্ধ এবং দ্বিতীয় রচনাটি পয়ার ছন্দে লিখিত একটি কবিতা। কবিতাটি একজন নামহীন লেখিকার। লেখিকা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা কবিতাকারে লিখেছেন।
বহু বিবাহ
বর্ষ ৩ | সংখ্যা ২ | জ্যৈষ্ঠ, ১২৭২ । June, ১৮৬৫ । পৃ: ২১-২৩
বহু বিবাহ প্রস্তাবটি আলোচনা না করিতেছেন, আজ কাল এরূপ লোকই বিরল। সংবাদ পত্রিকা সম্পাদকেরা যিনি যেরূপ বুঝিয়া উঠিতেছেন, তিনি তদ্রূপ যুক্তি সহকারে আপন আপন অভিপ্রায় নানাপ্রকার কৌশল-পুষ্প দ্বারা সজ্জীভূত করিয়াছেন। যথা বিবেচনা, আমাদিগের ইচ্ছাও তদ্বিষয়ে কিছু বক্তৃতা করিতে বাগ-যন্ত্রকে আদেশ করিতেছে।
এক বিধাতা-পুরুষই স্ত্রী ও পুরুষ উভয়কে সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহা স্বীকার করিতে যেমন কাহারও কোন আপত্তি নাই, তদ্রূপ ঈশ্বর এই উভয় জাতীয়কেই সমভাবে শাসন প্রতিপালন ও রক্ষা করেন, ইহাও সকলেই স্বীকার করিবেন। যে দুষ্কর্ম্মে স্ত্রী লোক পাপিনী হয়, সেই দুষ্কর্ম্ম করিয়া পুরুষ ঈশ্বরের নিকটে নিষ্পাপী হইতে পারেন না। কিন্তু আমাদিগের দেশের প্রচলিত প্রথা এই ন্যায় ও যুক্তি পথের বিপরীত পথ গামিনী। এদেশে স্ত্রী ব্যভিচারিণী হইলে যেমন লোকের নিকট ঘৃর্ণিতা, নিন্দিতা ও সামাজিক দণ্ডে দণ্ডিতা হয়েন, ব্যভিচারী পুরুষ কি তদ্রূপ হইয়া থাকেন? কখনই নহে। দুষ্কর্ম্ম করিলে স্ত্রী লোক যেরূপ পাপিনী হয়, পুরুষ তদ্রূপ হয় না। এই সংস্কারটিই আমাদের দেশের সকল অনর্থের মূল হইয়াছে। পুরুষ স্বচ্ছন্দে পরদার সেবা করিতেছেন, স্ত্রী পর পুরুষ সেবা করিলেই মহানর্থ উপস্থিত হয়। বাস্তবিক ঈশ্বরের নিকটে, সুতরাং ন্যায় ও যুক্তির নিকটে পরদার-সেবক পুরুষ ও পর পুরুষ সেবিকা স্ত্রী উভয়ই একরূপ। ঈশ্বরের অনুতাপ বৃত্তি উভয়কেই এক রূপ যাতনা দিয়া থাকে, এবং পরকালে উভয়ই এক রূপ দণ্ড উপভোগ করিবেক। আমাদিগের দেশীয়েরা ইহার বিপরীত পথাবলম্বী। তাঁহারা স্ত্রী জাতির অপরাধই অধিক ধর্ত্তব্য বোধ করেন। পুরুষের দোষ, দোষ বলিয়াই স্বীকার করিতে চাহেন না। কিন্তু উচিত বিবেচনা করিতে হইলে এ দেশের স্ত্রী লোকেরা যেমন মূর্খ, ও কর্ম্মাকৰ্ম্ম জ্ঞান বর্জ্জিতা, তাহাদিগের দোষ লঘু এবং পুরুষের দোষ গুরু বিবেচনা করা কর্ত্তব্য। আমাদিগের এতাবৎ বক্তৃতাতে পাঠকগণ একে আর বিবেচনা করিবেন না। আমরা স্ত্রী লোকদিগকে শাসন করিতে নিষেধ করিতেছি তাহা নহে; যেরূপ স্ত্রী লোকে শাসিতা হয়, তদ্রূপ পুরুষও শাসিত হউক, এই আমাদিগের বক্তৃতার প্রধানোদ্দেশ্য৷
পুরুষ সবল, স্ত্রী অবলা ইহা স্বভাব সিদ্ধ। অধিকন্তু এদেশীয় স্ত্রী লোকেরা মূর্খ। এবং সর্ব্বপ্রকারে পুরুষের অধীনা। নির্দ্দয় পুরুষেরা আপনাদিগের বল বিক্রম কেবল স্ত্রী লোকের প্রতি খাটাইয়াছেন। স্ত্রী বিয়োগে পুরুষ স্বচ্ছন্দে যতবার ইচ্ছা ততবার দার পরিগ্রহ করিতেছেন, বিধবা স্ত্রী পুনর্ব্বার স্বামী পরিগ্রহণ করিলেই একবারে অপরাধিনী হইলেন। শাস্ত্র রক্ষা-কর্ত্তারা খড়্গহস্ত হইয়া উঠিলেন। বহু বিবাহ ঐ প্রথারই অনুবর্ত্তী। পুরুষ যত ইচ্ছা তত বিবাহ করিবেন; কিন্তু স্ত্রী লোকের পক্ষে আঁটা আঁটি। এক স্ত্রী সত্ত্বে পুরুষ অন্য স্ত্রীকে বিবাহ করিয়া স্বচ্ছন্দে নিরপরাধিনী অবলার শয্যাকণ্টক উপস্থিত করিবেন, কিন্তু স্ত্রী অন্য স্বামীকে বরণ করা দূরে থাকুক, অন্য পুরুষের সাথে কথা কহিলেইঅনর্থ উপস্থিত হয়। যাঁহারা এক স্ত্রী সত্ত্বে অন্য স্ত্রীর পাণিগ্রহণ করিয়া প্রথম স্ত্রীর ক্লেশপ্রদ হয়েন, তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, তাঁহার স্ত্রী যদি তাঁহার সাক্ষাতে অন্য স্বামীর হস্তগতা হয়, তখন তাঁহার অন্তঃকরণে কোন ক্লেশ উপস্থিত হয় কি না? যদি হয়, তবে তিনি অন্য স্ত্রীকে বিবাহ করিলে তাঁহার পূর্ব্ব স্ত্রীরও তদ্রূপ হইতে পারে। এখন বিবেচনা করিয়া দেখুন, যে স্ত্রী তাঁহাকে আপন জীবনের সহিত মান সম্ভ্রম সমুদায় সমর্পণ করিয়া সর্ব্ব প্রকারে তাঁহার অধীনা হইয়াছে তাহাকে এই প্রকারে ক্লেশ দেওয়া অধার্ম্মিক ও নির্দয়ের কর্ম্ম কি না। এবং অধার্ম্মিক ও নির্দ্দয় লোক ইহকালে লোকের নিকট নিন্দিত ও রাজদ্বারে দণ্ডিত হইতে পারে, পরকালেও ঈশ্বর সমীপে দণ্ডনীয় হইবে। অতএব যে প্রথা দ্বারা এত দূর পর্য্যন্ত অপরাধ সংঘটন হইতেছে, তাহাকে দূরবর্ত্তী করাই কর্ত্তব্য। কিঞ্চিৎ বিবেচনা করিয়া দেখিলে বিলক্ষণ উপলব্ধি হইবেক, এই কুপ্রথার অনুবর্ত্তী আরো কতকগুলি বৃহৎ দোষ আছে। অনেক স্ত্রী লোকের অকাল মৃত্যু, বিবাদ ও কলহ, (এক বিষয় বহু অংশে বিভক্ত) ব্যভিচার প্রভৃতি অনেক গুলি গুরু দোষ এই প্রথাকে আশ্রয় করিয়া রহিয়াছে। তজ্জন্য ভারতবর্ষ ক্রমান্বয়ে অনুশোচনীয় হইতেছেন। যিনি এই সৰ্ব্বনাশিনী কুপ্রথাকে দূরবর্ত্তিনী করিয়া আপনার জন্মভূমি ভারতবর্ষকে শোচনা শূন্য করিতে সযত্ন হইয়াছেন, তিনি আমাদিগের স্মরণীয় কেন না হইবেন? যিনি এই কুপ্রথাকে রক্ষা করিতে যত্নশীল হইয়া পূর্ব্বোক্ত দোষ গুলির আশ্রয় হইবেন, তিনি ন্যায়বান্ ও জ্ঞানিগণের যত শ্রদ্ধাপাত্র, তাহা পাঠকগণ সহজেই বুঝিতে পারেন, অধিক লেখা বৃথা বাক্যব্যয় মাত্র।
সাধারণে যে কুপ্রথা নিবারণ করিতে রাজার সহায়তা প্রার্থনা করে, বস্তুতঃ যদ্বারা সাধারণের বিলক্ষণ অনিষ্ট হইতেছে, এরূপ কুপ্রথা কুলপরম্পরাগত এবং অল্প সংখ্যক লোক তদুচ্ছেদে প্রতিবাদী হইলেও রাজাকে তাহা অগ্রাহ্য করিয়া ন্যায়পথ রক্ষা করাই কর্ত্তব্য। আমরা ভরসা করি, লার্ড ওয়েলেসলি ১৮০৫(?) খৃষ্টাব্দের ২০এ(?) আগষ্ট গঙ্গাসাগরে শিশু সন্তান নিক্ষেপ রূপ নিতান্ত জঘন্য ও অসভ্য রীতি নিবারণের আইন প্রচলিত করিয়া, এবং লার্ড উইলিয়ম বেণ্টিক ১৮২৯ খৃষ্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর অবৈধ নিষ্ঠুর সহমরণ প্রথা রহিত করিয়া, যেমন এদেশের চিরস্মরণীয় হইয়াছেন, সর জন লরেন্স কি এই বহু বিবাহ প্রথাটি রহিত করিয়া তদ্রূপ আমাদিগের স্মরণীয় হইবেন না?
(‘নিতান্ত অনুগত কোন কুলীন দুহিতার’ লেখা )
বর্ষ ৩ | সংখ্যা ৩ | আষাঢ়, ১২৭২ । July, 1865 | পৃ: ৩৭
সম্পাদক মহাশয়
অনুগ্রহ করিয়া সামান্যার সামান্য রচনাটি সংশোধনান্তর গ্রামবার্ত্তায় স্থান দানে বাধিতা করিবেন।
পয়ার
অন্তরের দুঃখ কিসে অন্তর্হিত হয়।
প্রকাশ করিতে নারে নারীর হৃদয়॥
অষ্টাদশে পদার্পণ করিলে কামিনী।
অষ্টমের তুল্য পিতা দিবস যামিনী॥
কুল রক্ষা হেতু সদা করেন সন্ধান।
কিসে তিনি হইবেন কুলীন প্ৰধান৷৷
ঘোটক সমান এক ঘটক আনিয়া।
আনিতে বলেন তারে বর অন্বেষিয়া॥
অনেক ভ্রমণে মিলে অশীতির বর।
সঙ্গে করি উপনীত ঘটক প্রবর॥
পরিচয়ে জানা গেল ফুলের মুকুটী।
যমালয় যাবে কাল তথাচ ভ্রূকুটি
ঘটকের ঘটনায় বর হল স্থির।
শুভক্ষণে আনি কন্যা করিল বাহির॥
দেখিয়া বরের রূপ সবে হতজ্ঞান।
মন ব্যথা পেয়ে বালা ত্যজিয়াছে প্রাণ*।।
আহা মরি কুলীনের কিবা সংস্কার।
চৈতন্য নাহিক হল দেখে শবাকার॥
দণ্ডবৎ করি মোরা এমন কুলেরে।
শত২ ভ্রূণ হত্যা হয় যার খুরে॥
তাই বলি মহাশয় দেখ দেখি চেয়ে।
পঁচিশ পেরেছি তবু হইল না বিয়ে।।
শুনেছি দেশের হিত করিতে আপনি।
ধরিয়াছ মহাশয় স্বহস্তে লেখনি৷৷
গ্রামবার্ত্তা আমাদের বার্ত্তা কি জানেনা।
অথবা বল্লাল বুঝি করিয়াছে মানা॥
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১২৭২ সাল
নিতান্ত অনুগত কোন কুলীন দুহিতা।
*অনুগ্রহ প্রকাশে এই ঘটনাটি স্পষ্ট করিয়া লিখিবেন (সম্পাদক)
প্রকল্পPeriodicalDB-র অন্যান্য পত্রিকা সংগ্রহ
প্রকল্পPeriodicalDB-তে প্রতিমাসে বাংলা পত্রিকার রচনাসূচী সংযোজিত হচ্ছে। এই website-এর মাসিক subscription মূল্য দিনপ্রতি ₹৫ হিসাবে ₹১৫০।
দুষ্প্রাপ্য পত্রিকা বিবাহ
Privacy policy